HomeBengaliহোমিওপ্যাথির মূল তথ্য বা কার্ডিনাল প্রিন্সিপালস অফ হোমিওপ্যাথি

হোমিওপ্যাথির মূল তথ্য বা কার্ডিনাল প্রিন্সিপালস অফ হোমিওপ্যাথি

হোমিওপ্যাথির মূল তথ্য বা কার্ডিনাল প্রিন্সিপালস অফ হোমিওপ্যাথি (The Cardinal Principal of Homeopathy)



হ্যানিম্যান সুদীর্ঘকাল ব্যাপি গবেষণা ও অনুসন্ধান করে জানতে পারেন যে প্রকৃতির আরোগ্য নীতি প্রধানত সাতটি মূল তথ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। তথ্যগুলো তিনি অর্গানন এ লিপিবদ্ধ করে গেছেন।

1. সমতত্ত্ব বা law of similia: তিনি সর্বপ্রথম লক্ষ্য করেন যে প্রকৃতির আরোগ্যের প্রথম নিয়ম হলো সমের প্রতিকার সম। তাই তিনি হোমিওপ্যাথির মূল তত্ত্ব বর্ণনার প্রথম স্থানেই তত্ত্ব কে প্রতিষ্ঠিত করেন।
Similia Similibus Curanter অর্থাৎ সমের প্রতিকার সম –  এই তত্ত্ব হ্যানিম্যানের বহু পূর্ব থেকেই পৃথিবীতে জানা থাকলেও স্বতন্ত্র একটা চিকিৎসা পদ্ধতি রূপে তিনি এর প্রথম প্রবর্তন করেন। বস্তুত এই প্রধান স্বতঃসিদ্ধ সত্যের উপরই হোমিওপ্যাথি প্রতিষ্ঠা। এই তত্ত্বকে হ্যানিম্যান অর্গাননে  সদৃশ্য সদৃশ্য দ্বারা চিকিৎসিত হোক – এই নির্দেশাত্মক বাক্য রূপে প্রয়োগ করেন। এর মূল বক্তব্য হলো সামগ্রিকভাবে রোগীর উপসর্গের পর্যালোচনা করে সুস্থ শরীরে উপসর্গ উৎপাদনক্ষম ভেষজ জাত ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে। ভেষজের উপসর্গ ও লক্ষণ সমূহ যত রোগের উপসর্গ লক্ষণের অনুরূপ হবে আরোগ্য ক্রিয়াও তত সুনিশ্চিত রূপে প্রতিপন্ন হবে।

২. অমিশ্র তত্ত্ব বা Low of Simplex: এই তথ্য অনুসারে একসময় মাত্র একটি ঔষধ প্রয়োগ দ্বারা চিকিৎসা করতে হবে। কারণ প্রত্যেক বস্তুর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে এবং এইজন্যই তা অপর বস্তু থেকে পৃথক। একাধিক ভেষজ বস্তুর মধ্যে সাধারণ বৈশিষ্ট্যের সমতা থাকতে পারে। কিন্তু সূক্ষ্ম রূপে পর্যবেক্ষণ পরীক্ষণ ও বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে প্রত্যেক বস্তুর তার নিজস্ব সত্তা ও কার্যের বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে। অতএব ওষুধকে একক ও অমিশ্র হতে হবে, আলোচনা, পরীক্ষা ও প্রয়োগ করতে হবে। কারণ দুইটি পৃথক বস্তুর সহাবস্থানে তৃতীয় একটি বস্তু সংঘটিত হয়। ওই নব উৎপাদিত বস্তু টি হয় উৎপাদক বস্তু দুটির থেকে পৃথক, স্বতন্ত্র গুন ও বৈশিষ্ট্যের আবির্ভাব ঘটে নতুবা পূর্বোক্ত বস্তু দুইটির গুণের তারতম্য দেখা দেয়, অর্থাৎ পূর্বের ন্যায় গুণসম্পন্ন থাকেনা। একাধিক বস্তু মিশ্রিত হলে তাদের আপেক্ষিক পরিমাণের বৃদ্ধি হয় বটে কিন্তু তাদের গুণগত বৃদ্ধি নাও হতে পারে। 500 গ্রাম কোন বস্তুর সঙ্গে পঞ্চ গুণসম্পন্ন 500 গ্রাম অপর একটি বস্তু মিশ্রিত হলে পরিমাণগত ভাবে ওই মিশ্রণটি 1000 গ্রাম হলেও গুণগত ভাবে তাদের গুণের সমাহার যে 6+ 5 বা 11 হবে তার কোনো মানে নেই।

3. অনু মাত্রা তত্ত্ব বা Low of minimum: ভেষজ বস্তুর যে পরিমাণ মাত্রায় কেবলমাত্র শরীরে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় শুধু সেই পরিমাণ ভেষজ প্রয়োগ দাঁড়াই রোগ আরোগ্য করতে হবে। কারণ অধিকমাত্রায় ভেষজের শরীরে অধিক মাত্রায় উত্তেজনা ও আলোড়ন সৃষ্টি কারণ হয়, ফলে শরীরের যান্ত্রিক বিকৃতি ও অবাঞ্ছিত রোগ বৃদ্ধি ঘটায়। সুনির্বাচিত সম  লক্ষণ যুক্ত ভেষজের সক্রিয় প্রভাব তার অনু পরিমাণ দ্বারাই সম্পন্ন হয়। সুতরাং প্রকৃত রোগ আরোগ্যের জন্য অবশ্যই ভেষজকে যথাসম্ভব অনু মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।

4. ভেষজ পরীক্ষা তত্ত্ব বা Low of Drug Proving: ভেষজকে আগে সুস্থ মানুষের শরীরে প্রয়োগ করে পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষণ এর মাধ্যমে ওই ভেষজ সুস্থ শরীরে কি কি উপসর্গ উৎপাদন করছে তা লিপিবদ্ধ করে রাখতে হবে। পরে ওই ভেষজ ঠিক যেমন যেমন উপসর্গ উৎপাদনে সক্ষম অনুরোধ উপসর্গ যুক্ত অসুস্থ শরীরে প্রয়োগ করতে হবে। সুদৃশ্য বিধানমতে কেবলমাত্র সেই সমস্ত রোগীকে প্রয়োগ করতে হবে যার ভেষজ গুণাবলী সুপরিজ্ঞাত, অর্থাৎ সুস্থ শরীরে ওই ভেষজ কি কি উপসর্গ সৃষ্টি করতে সক্ষম তা আগে থাকতে অবহিত হতে হবে। অপরাপর চিকিৎসা পদ্ধতিতে ইতর প্রাণীর ওপর ভেষজ প্রয়োগ দ্বারা তার গুণাবলী পরিজ্ঞাত হতে হবে। তাতে ভেষজের সূক্ষ্ম আরোগ্য কর বিশেষ করে মানসিক লক্ষণাবলী অজ্ঞাত থাকে। কিন্তু সুস্থ মানুষের শরীরে সদৃশ্য বিধানমতে ভেষজ পরীক্ষা দ্বারা ভেষজের সূক্ষ্ম আরোগ্যকরণ গুণ এবং মানবমনের উপর তার প্রভাব প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি সকল পরিজ্ঞাত হওয়া যায়।

5. পুরাতন ব্যাধি বাঁধ বা Low of Chronic Disease: দীর্ঘকালব্যাপী গভীর পর্যবেক্ষণ পরীক্ষণ এবং গবেষণা দ্বারা হ্যানিম্যান প্রমাণ করেন যে সকল প্রকার পুরাতন ব্যাধির মূল কারণ হলো তিনটি রোগ বীজ বা Miasm. এই তিনটি রোগ বীজ হল Psora, Sycosis, এবং Syphylis.

জীবের দেহ জড়পদার্থের  দ্বারা সংঘটিত হলেও তার অভ্যন্তরে মন, প্রাণ, আত্মা, ইচ্ছা,অনিচ্ছা, কামনা, বাসনা ইত্যাদির অস্তিত্ব আমরা অনুভব করি। জগতের সকল পদার্থই কোন না কোন শক্তি দ্বারা স্বয়ংক্রিয় হয়। স্বয়ংক্রিয় আমাদের দেহ ও প্রাণশক্তি vital force দাঁড়া স্বয়ংক্রিয় হয়। প্রাণশক্তি আবার মনের দ্বারা পরিচালিত। চিন্তা, কামনা, বাসনা, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি এগুলো হলো মনের ক্রিয়া কলাপ। যেহেতু চিন্তাধারা মন, মনের দ্বারা প্রাণ এবং প্রাণের ধারা দেহ পরিচালিত হয় সেহেতু চিন্তার সু বা কু প্রভাব ক্রমাগত মন-প্রাণ এবং দেহের উপর পড়বে।

মনুষ্য দেহ সুমনন পরিচালন যোগ্য অর্থাৎ দেহাভ্যন্তরস্থ মন যদি তার চিন্তাধারা সুপথে পরিচালিত করে তবে তার প্রভাবে মন-প্রাণ এবং দেহের সুশৃংখলা বজায় থাকবে। কিন্তু জীব প্রকৃতির এই নিয়ম যদি লংঘন করে অর্থাৎ মন তার চিন্তা ধারা কোন পথে পরিচালিত করে তবে ওই কুচিন্তাধারা প্রথমে মনের সুশৃঙ্খলা ছিন্ন করবে। মন যেহেতু প্রাণের পরিচালক সুতরাং বিশৃঙ্খলা মনের প্রভাব প্রাণে এবং বিশৃংখল প্রাণশক্তির কু প্রভাব স্থূল দেহের মাধ্যমে প্রকাশিত হবে। চিন্তা ধারাকে কু পথে পরিচালিত করলে মনের সুশৃঙ্খলা ছিন্ন হয়ে দেহে যে রোগের সৃষ্টি হয় মহাত্মা হ্যানিম্যান তাকে সূরা নামে অভিহিত করেন। তিনি বলেন তিনটি রোগ বীজ সমস্ত পুরাতন ব্যাধির কারণ হলেও এদের মধ্যে Psora- র কাজই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, এটাই হলো জীবের সমস্ত ব্যাধির প্রকৃত মুলিভূত কারণ।

6. ভেষজ ক্রিয়াশীলতা বাদ বা Low of Drug Dynamization: সম চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসারে জীবের স্থূল দেহকে স্বয়ংক্রিয় করে প্রাণশক্তি বা vital force। প্রাণশক্তি স্বয়ংক্রিয় শক্তি। রোগ শক্তি দ্বারা প্রথমত এই প্রাণশক্তি বিক্রিত হয়। সুতরাং প্রাণশক্তিকে ব্যাধি মুক্ত করতে হলে ভেষজের স্বয়ংক্রিয় শক্তি দ্বারাই তাকে ব্যাধি মুক্ত করা প্রয়োজন।

স্থূল অবস্থান ভেষজের অন্তর্নিহিত আরোগ্য কর সক্রিয় শক্তি সুপ্ত অবস্থায় থাকে। পারস্পারিক ঘর্ষণ মন্থন বিচূর্ণ ইত্যাদি পদ্ধতি দ্বারা ভেষজের অন্তর্নিহিত এই শক্তিকে জাগ্রত করতে পারা যায়। অনু মাত্রায় ভেষজের সক্রিয় আরোগ্য কর শক্তির প্রয়োগে রোগ শক্তি দ্বারা বিকৃত প্রাণশক্তি সম্পূর্ণরূপে রোগ মুক্ত হয়ে পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে।

7. প্রাণশক্তি বাগ বা Low of Vital Force: জীবের দেহটি একটি জড় পদার্থ। কারণ মৃত্যুর পর আর এই দেহের কোন রোগ ক্রিয়া করার ক্ষমতা থাকেনা। সুতরাং প্রাক মৃত্যু পর্যন্ত কোন শক্তি যে এই দেহকে পরিচালিত করত এই বিষয়ে কোন সন্দেহ থাকে না। হ্যানিম্যান প্রমাণ করেন যে জীবের স্থূল দেহের সজীবতা এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ শৃঙ্খলা যে শক্তি দ্বারা সাধিত হয় তাহলো প্রাণশক্তি বা Vital Force.
কোন জড় পদার্থ অপশক্তির সাহায্য ব্যতিরেকেই নিজে স্বয়ংক্রিয় হতে পারে না। একটি জড় পদার্থ অপর জর পদার্থকে ক্রিয়াশীল করতে পারেনা, যদি না তার পিছনে কোন শক্তি থাকে, সুতরাং আমাদের এই জোরও দেহ যে স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে তার পেছনে যে কোন শক্তি কাজ করছে তা আমরা সহজেই অনুমান করি। এই শক্তিকেই হ্যানিম্যান প্রাণশক্তি বলেছেন। তিনি বলেন প্রাণশক্তি দেহের পরিচালক। দেহের সকল প্রকার স্বাভাবিক ক্রিয়া ও অনুভূতির মূল উৎস এই প্রাণশক্তি। রোগ শক্তি যখন জিবকে কে আক্রমণ করে তখন প্রথমেই এই প্রাণশক্তি আক্রান্ত হয়। দেহে যে কষ্টকর উপসর্গগুলি দৃষ্ট হয় তা হল বিকৃত প্রাণশক্তির স্থূল দেহে বহিঃ প্রকাশিত রূপ। জীবের যখন রোগ মুক্তি ঘটে তখন চিকিৎসা দ্বারা  প্রাকৃতিক নিয়মে এই প্রাণশক্তি আগে রোগমুক্ত হয়।  

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments